বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে ৩ পার্বত্য জেলায় শুরু হয়েছে বর্ণাঢ্য আয়োজন

চট্টগ্রাম নিউজ ডেস্ক

প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম মেনে প্রতিবছরই ফিরে আসে বিজু, বিহু, বিষু, সাংগ্রাই উৎসব। পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণের উচ্ছ্বাস-উচ্ছলতা। নব আনন্দে জাগে পাহাড়ের প্রাণ।পুরো পার্বত্যাঞ্চল আর সাগর বিধৌত কক্সবাজারজুড়ে শুরু হয় আনন্দ-উচ্ছ্বাস।

বর্ষবরণকে ঘিরে পাহাড়ি জনপদের উৎসব দিন দিন সারাদেশের মানুষের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ফলে বৈসাবি উৎসব হয়ে ওঠে পাহাড়ের প্রাণের উৎসব।

বরাবরের মতোই বিদায়ী বছরের সব দুঃখ-কষ্ট আর গ্লানি পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে সোমবার নতুন বছরে পথচলা শুরু করেছে পাহাড়, হ্রদ আর অরণ্যঘেরা জনপদের মানুষ। বর্ষবরণ ও বিদায়ের অনুষ্ঠান বৈসাবি ঘিরে উৎসবের আমেজ এখন তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবানের জনপদে।

বিলাইছড়িতে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যে দিয়ে বিজু উদযাপন অনুষ্ঠিত হলো। এতে পাহাড়ে জমে উঠেছে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু’র উৎসব।

সোম,মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার পর্যন্ত উপজেলার ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে বিজু উৎসব উদযাপন হবে বলে জানা যায়।

সোমবার সকালে বাজার ঘাট এলাকায় নদীতে ফুল ভাসানো হয়,পরে বাজার হয়ে উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা স্টোডিয়াম দীঘলছড়ি মাঠে এসে র‍্যালিটি শেষ করে বিভিন্ন ইভেন্টের ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলা, ডিসপ্লে, পিঠা উৎসব ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়

রাঙামাটি শহরের রাজবাড়ী ঘাটে গতকাল সকালে চাকমা জনগোষ্ঠীর ফুলবিজুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

একইভাবে সকাল ৯টায় শহরের গর্জনতলি এলাকায় পানিতে ফুল ভাসিয়ে বৈসুক উৎসবের সূচনা করে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী। পানিতে ফুল ভাসানোর পর বাড়ির প্রবীণ ব্যক্তিদের স্নান, সম্মাননা প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ত্রিপুরাদের বৈসুক।

ফুলবিজুর পর অনুষ্ঠিত হবে মূল বিজু। বাড়ি বাড়ি বেড়ানো আর খানাপিনার মধ্য দিয়ে পালিত হবে বিজুর মূল আয়োজন। এ ছাড়া রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিতমরমে অনুষ্ঠিত হয় মারমা জনগোষ্ঠীর সাংগ্রাই জলোৎসব।

খাগড়াছড়িতে নদীতে ফুল ভাসিয়ে চাকমারা ফুল বিজু উদ্যাপন করেন। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীদের হারিবৈসুর (ফুল পূজা) মধ্য দিয়ে তিন দিনের বৈসু উৎসব শুরু করেছে। অন্যদিকে সাংগ্রাই উৎসবে মাতবে মারমারা।

খাগড়াছড়ি সদরের খবংপুড়িয়া এলাকা দিয়ে চেঙ্গী নদীতে ফুল ভাসাতে ভিড় জমায় শত শত চাকমা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। সূর্যোদয়ের আগেই চাকমারা দলে দলে ছুটে যায় নদীর ধারে। কেউবা একাকী আবার অনেকে সারিবদ্ধ হয়ে নদীতে নানা রঙের ফুল ভাসায়। ফুলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে চেঙ্গী নদী। সর্বজনীন বৈসাবি উদ্যাপন কমিটির ব্যানারেও পৃথকভাবে নদীতে ফুল ভাসানো হয়। এ ছাড়া শহর ও শহরতলির বিভিন্ন খাল এবং প্রাকৃতিক ছড়াও ফুলে ফুলে ভরে যায়। ছোট্ট শিশুরা নদীর পানিতে ভিজে আনন্দ উল্লাস করে নতুন বছরকে আহ্বান জানায়।

প্রতিবছরের মতো এবারও পানখাইয়াপাড়ায় শুরু হয়েছে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। এর আগে মধুপুর এলাকা থেকে সর্বজনীন বৈসাবি উদ্যাপন কমিটির উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।

এ ছাড়া দুপুরে ‘য়ামুক’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী গরয়া নৃত্য উৎসব।

সাংগ্রেং পোয়ের : নববর্ষে কক্সবাজারে বাঙালি সংস্কৃতির নানা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী ‘সাংগ্রেং পোয়ে’ বা জলকেলি হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উৎসব। তবে বাংলা নববর্ষের তিন দিন পর শুরু হয় রাখাইন অব্দ (মঘি সন)। রাখাইনদের তিন দিনব্যাপী জলকেলি উৎসবও শুরু হবে ওই দিনে। নতুন বছরের সূচনালগ্নে ‘সাংগ্রেং পোয়ে’র তিন দিনের উৎসব শুরু হবে। অবশ্য পূজা-পার্বণের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় আরো চার দিন আগে। নতুন বছরের আগমনীতে কক্সবাজারের রাখাইন পল্লীগুলোয় ইতিমধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।

ইতিহাসবিদদের মতে, রাখাইনদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার প্রচলন হয় ১৫ ধন্যাবতি যুগ (৩৩২৫ খ্রিস্ট-পূর্ব) থেকে। হাজার বছর ধরে রাখাইন সভ্যতার ক্রমবিকাশে তাদের সংস্কৃতি প্রথায় ঘরে ঘরে নববর্ষ উৎসব উদ্যাপন করে আসছে।

রাখাইনদের এ উৎসবের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অতীতের সব ব্যথা-বেদনা ও গ্লানি ভুলে ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সপ্তাহব্যাপী বর্ষবরণ উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব পানিখেলা বা জলকেলি। ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের রাখাইন পল্লী সাজানো হয় নবসাজে। পুরনো বছরের জীর্ণতা আর পাপ ধুয়ে-মুছে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দের বহিঃপ্রকাশই মূলত সাংগ্রেং উৎসব।

এ উৎসবকে সামনে নিয়ে নতুন প্রজন্মের সদস্যরাই বেশি মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য তো বলতে গেলে ‘মহা আনন্দের সময়’। কেননা এ উৎসবেই তারা তাদের লালিত স্বপ্ন বা অব্যক্ত কথা বলার স্বাধীনতা পেয়ে থাকে। পানি ছোড়ার অনুষ্ঠানে তারা সঙ্গী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও পেয়ে থাকে।

কক্সবাজার দেশের প্রধান পর্যটন শহর হওয়ার সুবাদে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পানিখেলা দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানের ভ্রমণপিপাসু লোকজন এ সময়টাকে আলাদাভাবে বেছে নেয়। রাখাইনদের অনুষ্ঠান দেখার জন্যও অনেক ভ্রমণপিপাসু এসে ভিড় করে। সে সঙ্গে জমে ওঠে কক্সবাজারে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ বার্মিজ ফ্যাশন মার্কেটগুলোও।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চট্টগ্রামনিউজ.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, মতামত, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি । আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন news@chattogramnews.com ঠিকানায়।

সর্বশেষ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভুবন ভোলানো হাসিতে মন জয় করা তাহসিনের সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে সেই তাহসিন, যে...

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত...

চট্টগ্রামে হান্ডির খাবারে তেলাপোকা, ১ লাখ টাকা জরিমানা

চট্টগ্রামে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণ, পোড়া তেল...

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন তার ৩ সহযোগীসহ যশোরে গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামসহ দেশ জুড়ে আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড...

৩১ জুলাই শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামে  শ্যামল চৌধুরীর ‘চন্দ্রপ্রভা’র প্রিমিয়ার শো

বাংলাদেশে নির্মিত এই প্রথম বুদ্ধের জীবনীভিত্তিক টেলিফিল্ম ‘চন্দ্রপ্রভা’ প্রিমিয়ার...

কথা রাখলেন সাংসদ সাচিং প্রু জেরী, ২৪ ঘন্টার মধ্যে সদর হাসপাতাল পরিদর্শন 

বান্দরবানে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বান্দরবান...

আরও পড়ুন

খাগড়াছড়িতে বিজিবির সঙ্গে সশস্ত্র চোরাকারবারীদের গোলাগুলি, ৪ আগ্নেয়াস্ত্রসহ গুলি উদ্ধার

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার যামিনীপাড়া সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে সশস্ত্র চোরাকারবারীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তবলছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৪ রাউন্ড...

বান্দরবানে সাঙ্গু নদীতে নৌকাডুবে নিখোঁজ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার

বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড়পাথর এলাকায় সাঙ্গু নদীতে নৌকাডুবে নিখোঁজ পর্যটক মো. জাওয়াদ উল ইসলাম মাহিয়ানের (২৪) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।রবিবার (২৬ জুলাই) সসকালে সাড়ে...

মানিকছড়ির ফার্মার্স ভ্যালি যেন পাহাড়ের চুড়ায় অর্গানিক ফলের একখণ্ড স্বর্গরাজ্য

পাহাড়ি জনপদ মানিকছড়ি। সবুজের বুক চিড়ে এগিয়ে চলেছে আকাবাকা পাহাড়ি পথ। যেদিকে চোখ যায় সবুজের সমারোহে মন জুড়িয়ে যায়। দুপাশে সবুজ পাহাড় আর তার...

বান্দরবানের থানচি-তিন্দুমুখ নৌপথ ভ্রমন ৩০ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ

সাম্প্রতিক নৌকাডুবির ঘটনার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বান্দরবানের থানচি সদর থেকে তিন্দুমুখ পর্যন্ত সাঙ্গু নদীপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল আগামী ৩০ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ...